Home

Showing posts with label ভোট বাগান মঠ. Show all posts
Showing posts with label ভোট বাগান মঠ. Show all posts

Friday, July 5, 2024

প্রথম বৌদ্ধ মঠের ইতিহাস | History of Bhot Bagan Math

তিব্বতের ইতিহাস বা লামা কি তার তেমন একটা আমার বেশি ধারনা নেই, তবে লামা তাদের জীবন সম্পর্কে জানার উৎসাহ টা প্রথম পাই সত্যজিৎ রায়ের রচিত ফেলুদার গ্যাংটকে গন্ডোগোল পড়ে, ইন্টারনেটে একটু খুঁজাখুঁজি করতেই বেরিয়ে এল একটা Article যাতে লেখা যে আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে ওয়ারেন হেস্টিংস এর সময়কালে তিব্বতী লামা রা ভারতে প্রথম তিব্বতী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, ব্যাস তার পর হাওড়া থেকে ট্রেনে সোজাসুজি চলে গেলাম লিলুয়া স্টেশনে, এরপর একটা টোটো পরে একটা হাত রিকশা করে পৌঁছে গেলাম একদম মঠের সামনে, প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত এক ঐতিহাসিক মঠের প্রাচীন নিদর্শন " ভোট বাগান মঠ " যার বর্তমান নাম শংকর মঠ , কথা বলছিলাম এখানকার স্থানীয় লোকজন বর্তমানে যে মঠের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন জ্যোতি তিওয়ারির সঙ্গে কি জানলাম কি এর ইতিহাস? কেনই বা পঞ্চেন লামা এই মঠ স্থাপনের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংস এর কাছে চিঠি লিখেছিলেন? কি এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব?

ভোট বাগান মঠ
ভোট বাগান মঠ

সময় টা ১৭৭৬ সালের কাছাকাছি, সেই সময় কোচবিহার ভুটানের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ততকালীন ইংরেজ প্রতিনিধি হেস্টিংস এর সহযোগিতায় কোচবিহারের রাজা ভুটানি জনগণকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিতে উদ্যত হলে তাতে হস্তক্ষেপ করেন পঞ্চেন লামা, তিনি শান্তি মীমাংসার প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে এ কথা ও জানা যায় যে তিব্বতীরা ভারতবর্ষকে ধর্মের জন্য একটি পবিত্র স্থান হিসেবে মনে করতেন এবং যাতে তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের লোকেরা এখানে কিছু সময় কাটাতে ও ধ্যান করতে পারেন তার জন্য হেস্টিংস এর কাছে পঞ্চেন লামা পুরান গিরি গোসাইন (বা গোস্বামী) নামে একজন হিন্দু সন্ন্যাসীকে দূত হিসেবে পাঠান।

পুরান গিরি যিনি পুরঙ্গীর নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি ছিলেন দশনামি সম্প্রদায়ের সদস্য, যেটি আদি শঙ্কর আচার্য প্রতিষ্ঠিত হিন্দু সন্ন্যাসী ঐতিহ্য। শিবের উপাসক, গোসাইনরা ছিল বাণিজ্য সন্ন্যাসীদের একটি অনন্য শ্রেণী, যারা এতটাই ধনী এবং শক্তিশালী ছিল যে তাদের প্রায়শই বাণিজ্য পথ পাহারা দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী থাকত। এদিকে হেস্টিংস ও চাইছিলেন যাতে তিব্বতের সঙ্গে একটা যোগ সুত্র থাকে কারণ পরে তা বানিজ্যিক উন্নতির ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা করবে,

অবশেষে ১৭৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হাওড়ার ঘুসুরিতে পুরঙ্গীরকে ৩০ বিঘা জমি লিজ দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে মন্দির দালানকোঠা তৈরি হতে থাকে এবং ৩০ বিঘা বিস্তৃত হয় ১৫০ বিঘা খালি জমিতে। প্রথম থেকেই, তান্ত্রিক অনুশীলনের সাথে হিন্দুধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্মের সমন্বয়ে, ভোটবাগান মিশ্র ধর্মের একটি স্থান।


ভোট বাগান মঠ
ভোট বাগান মঠ

মঠটি তৈরি হলে তিব্বতীরা এখানে আসতে শুরু করে এবং প্রথম দিকে পঞ্চেন লামা তিব্বত থেকে বেশ কিছু জিনিস এনেছিলেন, যার মধ্যে ছিল মহাকাল এবং তারার মূর্তি সেই সঙ্গে এসেছে ১০০ পিস সোনা, কার্পেট কাপড়ের ব্যানার। তবে মহাকালের মূর্তি অবশ্য মূল আকর্ষণ ছিল। এটি মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি এবং এর নয়টি মাথা, ১৮ টি পা এবং ৩৬ টি বাহু ছিল, প্রতিটিতে একটি অস্ত্র আঁকড়ে ধরেছিল এবং একটি মহিলা স্ত্রীকে ধরেছিল। তারার মূর্তি ছিল , নেপালী বৌদ্ধরা "প্রজ্ঞা পারমিতা" , চক্রসম্ভার, স্ত্রীর সাথে গুহ্যসমাজা, বক্র ভ্রকুটি এবং পদ্মপানি হিসাবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু তার পাশাপাশি ছিল হিন্দু দেবতা এবং শিব লিঙ্গ, পুরঙ্গীর এবং তার শিষ্যদের জন্য।


মহাকাল ও তারার মুর্তি
মহাকাল ও তারার মুর্তি

শোনা যায় ১৭৯৫ সালের কাছাকাছি সময়ে এই মঠটির ওপর সশস্ত্র ডাকাত বাহিনী আক্রমণ করে এবং সেই ডাকাত বাহিনীকে প্রতিহত করতে গিয়ে বীরের মতো মৃত্যু বরণ করেন পুরান গিরি গোসাইন, এবং সেই সঙ্গে ডাকাতরা চুরি করে নিয়ে যায় বহুমূল্যবান সেই মহাকালের মুর্তি যা পঞ্চেন লামা তিব্বত থেকে নিয়ে এসেছিলেন যার সঙ্গে মিশে ছিল না জানি হয়তো কত সহস্র বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

এর পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালের কাছাকাছি সময়ে মঠটির আর এক  মুল্যবান সম্পদ ও ঐতিহ্য তারার মুর্তি টি ও চুরি যায়,কিন্তু পুলিশ তা উদ্ধার করে পুনরায় তা মঠে পুর্ন স্থাপন করেছেন, তবে অনেকেরই তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, কারন যদি তা সত্যি উদ্ধার হয় এবং তাহলে তার সঙ্গে যে সকল ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িয়ে তার মুল্য অনেক তবে কেন তার নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান সরকার এতটা উদাসীন? কেনো তার পরিকাঠামো এতটা ঢিলে ঢালা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে?


ভোট বাগান মঠ
ভোট বাগান মঠ (অন্দরের চিএ)

যাইহোক মঠটির কাছে কতগুলি মন্দির জাতীয় সমাধি দেখতে পাওয়া যায়, জানা যায় গোসাইনদের মৃত্যুর পরে দাহ করা হয়নি, ভোটবাগানের প্রাঙ্গণের মধ্যে সমাহিত করা হয়েছিল। তাদের কবরের উপরে বাংলার “আত চালা শৈলীতে সমাধি নির্মাণ করা হয়েছিল। এই ধরনের ৯ টি সমাধি ছিল, সমাধিগুলির মধ্যে, শিব লিঙ্গগুলি স্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে একটি নিয়মিত পূজা করা অব্যাহত রয়েছে। অবশিষ্ট সমাধিগুলি বিভিন্ন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে; কিছু প্রায় ভেঙে পড়ছে, আবার কিছু আধুনিক সিমেন্ট দিয়ে প্যাচ আপ করা হয়েছে।


গোসাইনদের সমাধি
গোসাইনদের সমাধি

পুরঙ্গীরের মৃত্যুর পর, তার শিষ্য দলজিৎ গিরি গোসাইনের স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি দলজিৎগীর নামেও পরিচিত। দলজিৎগীরের মৃত্যুর পর তিব্বতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কিং রাজবংশ প্রজাদের উপর কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তিব্বতীদের ভারতে আসা বন্ধ হয়ে যায় |

১৯০৫ সালে উমরাও গিরির মৃত্যুর সাথে সাথে ভট মহন্তদের আদি বংশের অবসান ঘটে , কারণ তার কোন ব্যক্তিগত শিষ্য ছিল না। মঠটি একজন আদালতের রিসিভারের হাতে চলে যায় এবং দশনামি সম্প্রদায় ত্রিলোখ চন্দ্র গিরিকে মহন্ত হিসাবে নিযুক্ত করে। দেখা যাচ্ছে যে তিনি আর্থিক অসঙ্গতিতে জড়িত থাকার পরে ১৯৩৫ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বর্তমানে, ভোটবাগান মঠ আদালত-নিযুক্ত রিসিভারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিওয়ারি পরিবার সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কাজ করে এবং একজন স্থানীয় পুরোহিত হিন্দু অধিকার অনুসরণ করে দৈনিক পূজা পরিচালনা করেন। সম্প্রতি ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশনের তত্ত্বাবধানে এসেছে ভোটবাগান।



ভোটবাগান মঠ ছিল ভারতের সমভূমিতে প্রথম তিব্বতি বৌদ্ধ মন্দির ; প্রকৃতপক্ষে, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এটিই ছিল বিংশ শতাব্দীর পূর্ববর্তী তিব্বতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তিব্বতিদের বোঝাতে প্রাচীন ভারতে ব্যবহৃত "ভোট" শব্দটি সম্ভবত তিব্বতি শব্দ "বোদ" থেকে এসেছে, যার অর্থ তিব্বত। বাংলায় "বাগান" মানে বাগান, আর "মঠ" এর বাংলা অর্থ মঠ। তাই ভোটবাগানের অর্থ হবে তিব্বতি উদ্যান , এবং এটিই মূলত বোঝানো হয়েছিল।

ভোট বাগান মঠ
ভোট বাগান মঠ (বাহিরের চিএ)


তবে স্থানীয়রা প্রায়ই মন্দিরটিকে "শিব মন্দির" বা "শঙ্কর মন্দির" বলে উল্লেখ করে এবং ভবনটির সামনের দিকে "শ্রী শঙ্কর মঠ" নামটি দেখা যায়, এবং মঠটির প্রাঙন এখন স্থানিয় ছেলেদের খেলার মাঠে পরিনত হয়েছে, আর যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে আজকে তা মহাকালের ধংসের পথে |

Posted By Pradip Jana ( Article Writer )